আমা’র মা মাটির নিচে ঘুমাচ্ছে, রাতে আসবে

আমা’র মা অফিস থেকে আসবে। আমা’র মা মাটির নিচে ঘু’মাচ্ছে, রাতে আসবে। মায়ের কাপড় রেখে দিয়েছি ড্রয়ারে। হা’রা’নো মাকে নিয়ে নতুন শেখা ভাষায় বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ধরনের কথা বলে চলছে সাড়ে চার বছরের নূর মাহিম। তার মা রহিমা খাতুন প্রিয়া গাজীপুরের শ্রীপুর উপজে’লার মাইজপাড়া এলাকায় ট্রেন দু’র্ঘ’ট’নায় নি’হ’ত হন। রহিমা খাতুন প্রিয়াকে স্থানীয়রা মিম নামে চিনত।

এ ঘটনায় মোট পাঁচজন নি’হ’ত ও কমপক্ষে ২০ জন আ’’হত হন। নি’হ’ত একমাত্র রহিমা খাতুন প্রিয়া শ্রীপুর উপজে’লার বরমী ইউনিয়নের বালিয়াপাড়া গ্রামের শুভ হাসানের স্ত্রী’। সে দু’র্ঘ’ট’না কবলিত গার্মেন্টস শ্রমিকবাহী বাসের যাত্রী ছিলেন। বাসটি শ্রীপুরের তেলিহাটি ইউনিয়নের টেপিরবাড়ি এলাকার জামান ফ্যাশন লিমিটেডের শ্রমিক বহন করে কারখানায় নিয়ে যাচ্ছিল।

প্রিয়ার স্বামী শুভ হাসান বলেন, আট’ বছর আগে প্রিয়াকে তার মামাবাড়ি নারায়ণগঞ্জ থেকে ভালোবেসে বিয়ে করেন। প্রিয়ার পরিবারের কেউ জানতেন না তিনি শুভকে বিয়ে করছেন। বিয়ের খবর শেনার পর এই আট’ বছরে তার স্বজনেরা কেউ তাকে একদিন দেখতেও আসেনি। শ্বশুর-শাশুড়ি ও বাড়ির লোকদেরকে একান্ত আপন করে নিয়েছিল।

গত রোববার (২৪ জুলাই) দু’র্ঘ’ট’নায় প্রিয়ার মৃ’’ত্যুর খবর শুনে তার মা ওই দিনই এসেছিলেন তাকে দেখতে। আমা’র ছে’লেটার একটা ভবি’ষ্যতের কথা চিন্তা করে সে চাকরি নিয়েছিল। ছে’লেটার ভবি’ষ্যতের আগেই সে চলে গেল। সংসারটা চালাত সেই-ই। আমা’র সংসার অনেক ক’ষ্টে চলত। আমা’র চাকরি ছিল না। সেই তখন চাকরি করত। চাকরিতে গিয়ে সে ফিরে আসবে না এমন জানলে তাকে চাকরি করতে দিতাম না।

গত তিন মাস আগে স্ত্রী’ প্রিয়ার স’ঙ্গে সামান্য অ’ভিমান করে বাড়ি থেকে বের হন স্বামী শুভ হাসান। কিন্তু স্ত্রী’ প্রিয়ার স’ঙ্গে প্রতিদিন বেশ কয়েকবার মুঠোফোন, ম্যাসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপে ভিডিও কলে কথা ’হতো। শনিবার (২৩ জুলাই) রাতে ঘু’মাতে যাওয়ার আগে প্রিয়ার স’ঙ্গে তার শেষ কথা হয়। মান-অ’ভিমানের নানা কথার ফাঁ’কে যে কথাটি বলে প্রিয়া ফোন রেখে দিয়েছিল তা এখন আমাকে বেদনা দেয়। যদিও হাসি-আনন্দের মধ্যে কথা হচ্ছিল সেটি ছিল

‘তুমি যেদিন আসবা সেদিন আমাকে খুঁজে পাবে না।’ সত্যিই আমি কুমিল্লা থেকে এসে তাকে আর পাইনি। তার মৃ’’ত্যুর সংবাদ শুনে আমাকে আমা’র কর্মস্থল কুমিল্লা থেকে আসতে হয়েছে। সেই কথাটি এখন আমা’র জীবেন স্মৃ’’তি হয়ে গেছে। আমা’দের দুজনের মধ্যে অনেক মিল ছিল। দাম্পত্য জীবনে আমা’দের সাড়ে চার বছরের একটি মাত্র ছে’লে। ছে’লেটি এখন মা হারা।

প্রিয়ার শাশুড়ি শামসুন্নাহার বলেন, বউ হিসেবে প্রিয়া অনেক ভালো ছিল। শ্বশুর-শাশুড়িসহ সকলের স’ঙ্গে ভালো ব্যবহার করত। মা’রা যাওয়ার আগের রাতে আমাকে শেষ কথা বলে গিয়েছিল, মা আমা’র ছে’লেটারে দেখে রাইখেন। আমি ঘু’মাইতে যাই। সকালে সে কারখানায় যাওয়ার সময় আমি ঘু’মিয়েছিলাম।

প্রিয়ার শ্বশুর নুরুল ই’স’লা’ম বলেন, সে আমা’র ছে’লের বউ না, মে’য়ে বললেই চলে। সে যা করে গেছে তা ভোলার মতো না। সে কারখানায় গেলে আমাকে বলে যেত, আব্বা আমি যাইতেছি। কিন্তু আমি একটু অ’সুস্থ থাকায় সেদিন ফজরের নামাজের পর ঘু’মিয়ে পড়েছিলাম। তাই আমাকে আর ডাকেনি। সে যাওয়ার ঘণ্টাখানেক পর শুনি ট্রেনের স’ঙ্গে বাসের দু’র্ঘ’ট’না ঘটেছে। খবর নিয়ে গেলাম সেখানে। গিয়ে দেখি সবাইকে নিয়ে গেছে। আমা’র প্রিয়া পড়ে আছে। সেখান থেকে তার ম’রদে’হ বাড়িতে নিয়ে আসি।

প্রিয়ার প্রতিবেশী সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, মে’য়েটি অনেক ভালো ছিল। আমা’দের বাড়িতে আসত, আড্ডা দিত। অফিস ছুটি থাকলে আমা’দের বাড়িতে এসে গল্প-সল্প করত। অনেক ভালো ব্যবহার ছিল। তার মৃ’’ত্যুতে আম’রা এলাকাবাসী শোকা’হত। তার মতো এমন ভালো মে’য়ে ও বউ এ যুগে পাওয়া যায় না।

শ্বশুর বাড়ির সামাজিক ম’স’জিদের পাশেই প্রিয়ার কবর দেওয়া হয়েছে। রোববার (২৪ জুলাই) রাতে বালিয়াপাড়ার ওই ম’স’জিদের সামনেই তার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।

উল্লেখ্য, চলন্ত ট্রেনের ধাক্কায় ৫ জন নি’হ’ত হয়। আ’’হত হন আরও ২০ জন। এ দু’র্ঘ’ট’নায় পাঁচ সদস্যের ত’দ’ন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। বাংলাদেশ রেলওয়ের ঢাকা ও ময়মনসিংহের পাঁচজন কর্মক’র্তাকে ত’দ’ন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। সোমবার (২৫ জুলাই) ওই কমিটির সদস্যরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।এ ছাড়াও ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন গাজীপুর জে’লা প্রশাসক আনিসুর রহমান। এরইমধ্যে রেলক্রসিংয়ের দায়িত্বে থাকা গেটম্যান আল আমীনকে দায়িত্বে অবহেলার কারণে বরখাস্ত করেছে রেল কর্তৃপক্ষ।