কি’ডনির স’মস্যায় কী খাবেন, যা বাদ দেবেন

কিডনির সমস্যা দিন দিন বাড়ছে। জীবনপ’দ্ধতির বদল, অস্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণ, অতিরিক্ত ওজন, বেশি সময় বসে থাকাসহ নানা কারণে কিডনি রোগ ’হতে পারে।

যে কারণেই কিডনির সমস্যা হোক না কেন দীর্ঘ মেয়াদি কিডনি রোগের চিকিৎসায় প্রধান উপায় হল সঠিক পথ্য নির্বাচন। অন্যান্য রোগের

চেয়েও খুব হিসাব-নিকাশ করে কিডনি রোগীর চিকিৎসায় পথ্য নির্ধারণ করতে হয়। র’ক্তে ক্রিয়েটিনিনের মাত্রা বৃ’দ্ধিকে ধীর গতিতে রাখার জন্য সঠিক পথ্য কার্যকরী।

কিডনি রোগী কী কী খাবেন আর যেসব খাবার খাবেন না সে বি’ষয়ে বিস্তারিত জানিয়েছেন বিআরবি হাসপাতালের পুষ্টিবিদ ইসরাত জাহান।

সঠিক পথ্য মেনে চললে র’ক্তে ক্রিয়েটিনের মাত্রাকে অনেকটা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। রোগী ভেদে কিডনির পথ্য নির্ধারণে ভিন্নতা থাকে। র’ক্তে

ইলেকট্রোলাইটসের পরিমাণ, হিমোগ্লোবিনের মাত্রা, ইউরিয়া ও ইউরিক এসিডের পরিমাণ, র’ক্ত ও ইউরিনে এলবুমিনের পরিমাণ এবং ক্রিয়েটিনিনের মাত্রা ভেদে পথ্যকে সাজাতে হয়।

একজন ক্লিনিক্যাল ডায়েটেশিয়ানের পরামর’্শ নেয়া একান্ত জরুরি। সাধারণভাবে যে বি’ষয়গু’লো মনে রাখা প্রয়োজন সেগু’লো হল- ক্যালরি

কিডনি রোগীদের সাধারণত ক্যালরির চাহিদা অন্যান্য রোগীর তুলনায় বাড়ানো হয়। যথাযথ শক্তি প্রদান করার মাধ্যমে রোগীর মাংসপেশির সবলতা বজায় রাখতে ক্যালরি সাহায্য করে।

সাধারণত প্রতি কেজি ওজনের জন্য রোগী ভেদে ৩০ থেকে ৩৫ কিলোক্যালরি পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়। এই ক্যালরি রোগীকে শক্তি প্রদান করা ছাড়াও সচল এবং কর্মক্ষম রাখে।

কার্বোহাইড্রেট-কিডনি রোগীর মোট ক্যালোরি চাহিদার বেশিরভাগই কার্বোহাইড্রেটের মাধ্যমে পূরণ হয়। কার্বোহাইড্রেট কিডনি রোগীদের ক্ষেত্রে

বন্ধুবৎসল। খাবারে অন্যান্য পুষ্টি উপাদানের যথেষ্ট নিয়ন্ত্রণ করতে হয় বলে কাবোর্হাইড্রেটকে বেশি প্রাধান্য দেয়া হয়। ডায়াবেটিসে আ’ক্রা’ন্ত রোগীর ক্ষেত্রে শর্করার মাত্রা বিবেচনা করে কার্বোহাইড্রেট হিসাব করা হয়। ভাত, ময়দা, রুটি, চিড়া, সুজি, চালের গু’ঁড়া, চালের রুটি, সাগু’, সেমাই ইত্যাদি কিডনি রোগীর জন্য উত্তম কার্বোহাইড্রেট।

প্রোটিন-প্রোটিন নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত জরুরি। দীর্ঘ মেয়াদি কিডনি রোগে প্রতি কেজি ওজনের জন্য পয়েন্ট পাঁচ থেকে পয়েন্ট আট’ গ্রাম প্রোটিন বরাদ্দ করা যেতে পারে। যদিও এ হিসাব নির্ভর করবে রোগীর অবস্থা ও বিভিন্ন পরীক্ষার রিপোর্টের ওপর। সাধারণত ডাল, বাদাম, কাঁঠালের বিচি, সিমের বিচি ইত্যাদি রোগীকে বর্জন করতে হয়। প্রতিদিনের দৈনিক প্রোটিনের চাহিদা ডিমের সাদা অংশ, মাছ, মুরগির মাংস ও দুধ বা দই ইত্যাদি থেকে হিসাব করে বরাদ্দ করা হয়। গরু, খাসির মাংস, কলিজা, মগজ ইত্যাদি অবশ্যই এড়িয়ে যেতে বলা হয়।

চর্বি-বেশিরভাগ কিডনি রোগীই উচ্চ র’ক্তচাপের সমস্যায় ভোগেন। কিডনি রোগীদের যাতে র’ক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা বেড়ে না যায়- র’ক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে থাকে এবং ওজন নিয়ন্ত্রণে থাকে তাই চর্বির হিসাব যথাযথভাবে করতে হয়। সাধারণত স্যাচুরেটেট বা সম্পৃক্ত চর্বি জাতীয় খাবার, ভাজাপোড়া খাবার, ফাস্ট ফুড, ডিমের কুসুম এড়িয়ে যেতে হয়। রান্নার তেল ব্যবহারের ক্ষেত্রে উদ্ভিজ্জ তেল, সূর্যমুখী, কর্ন অয়েল, ক্যানোলা অয়েল ইত্যাদি ব্যবহারের পরামর’্শ দেয়া হয়। অনেক কিডনি রোগী ভয়ে তেল খাওয়া বন্ধ করতে দেখা যায়। যা একেবারেই স্বাস্থ্যসম্মত নয়। প্রতিদিনের রান্নায় চার চা চামচ (২০ এমএল) তেল ব্যবহার করলে ভালো।

সবজি- র’ক্তে পটাশিয়াম, ইউরিক এসিডের মাত্রা, ফসফরাস ইত্যাদির ওপর ভিত্তি করে সবজি হিসাব করা হয়। অতিরিক্ত পিউরিন ও পটাশিয়াম সমৃ’’দ্ধ শাকসবজি, পিচ্ছিল ও গাঢ় লাল রঙের শাকসবজি এড়িয়ে যেতে হবে। কিডনি রোগীদের জন্য চালকুমড়া, চিচি’ঙ্গা, ঝিংগা ইত্যাদি পানীয় সবজি উপকারী। উপকারী হলেও এগু’লোর পরিমাণ মেনে চলাও গু’রুত্বপূর্ণ। কাঁচা সবজির সালাদ, সবজি স্যুপ ইত্যাদি কিডনি রোগীদের এড়িয়ে চলতে হয়।

ফল-কিডনি রোগীদের ফল খাওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক ’হতে হয়। অক্সালিক এসিড, ইউরিক এসিড, পটাশিয়াম, র’ক্তচাপ ছাড়াও আরও অনেক কিছু বিবেচনা করে ফল নির্ধারণ করা হয়। তিন চারটি ফল রোগী ভেদে সীমিত আকারে দেয়া হয়। যেমন : আপেল, পাকা পেঁপে, পেয়ারা ইত্যাদি। অনেকেই কিডনি রোগ হলে ফল খাওয়া বন্ধ করে দেন। যা স্বাস্থ্যসম্মত নয়। এ ক্ষেত্রে র’ক্তে পটাশিয়ামের মাত্রা বিবেচনা করে ফল নির্ধারণ করতে হবে।

লবণ-লবণ বা সোডিয়াম নিয়ন্ত্রিত পথ্য কিডনি রোগীদের ক্ষেত্রে জরুরি। র’ক্তচাপ, র’ক্তে সোডিয়ামের মাত্রা, ইডিমা বা শরীরের পানি পরিমাপের ওপর ভিত্তি করে লবণের পরিমাপ করা হয়। সাধারণত দুই থেকে পাঁচ গ্রাম লবণ নির্ধারণ করা হয় যা নির্ভর করবে আপনার শারীরিক অবস্থা ও ডায়েটেশিয়ানের ওপর। আলাদা লবণ গ্রহণ পরিহার করতে হবে এবং অতিরিক্ত সোডিয়ামযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলতে হবে। যেমন : চিপস, পাপড়, চানাচুর, আচার ইত্যাদি। যা শুধু কিডনি রোগীর চিকিৎসায় নয়, কিডনি রোগ প্রতিরোধেও সাহায্য করে।

তরল বা পানীয়-কিডনি রোগীদের ক্ষেত্রে তরল নিয়ন্ত্রণ জরুরি। দৈনিক চা, দুধ, পানি সব মিলিয়ে তরলের হিসাব করা হয়। কোন রোগীকে কতটুকু তরল বরাদ্দ করা হবে তা নির্ভর করবে রোগীর অবস্থার ওপর। শরীরের ইডিমা, হিমোগ্লোবিনের মাত্রা, সোডিয়ামের মাত্রা, ইজিএসআর- এসবের মাত্রার ওপর ভিত্তি করে এক থেকে দেড় লিটার, কখনও কখনও দুই লিটার পর্যন্ত তরল বরাদ্দ হয়। অনেকেই্ অসুস্থ কিডনিকে সুস্থ করার জন্য অতিরিক্ত পানি খায়, এটি ভুল। দীর্ঘ মেয়াদি ক্রনিক কিডনি রোগী এ ধরনের খাবারের পরামর’্শ মেনে চললে কিডনিকে মা’রাত্মক জটিলতার হাত থেকে রক্ষা করা সম্ভব হয়। একঘেয়েমি হলেও ধৈর্যের স’ঙ্গে সঠিক পথ্য ব্যবস্থাপনা মেনে চলা প্রত্যেক কিডনি রোগীর জন্য জরুরি।

কিডনি রোগীদের দৈনন্দিন পরিচালনার জন্য খাদ্যতালিকা বা রুটিন অনুযায়ী খাবার খেতে হবে। নিচে তাদের খাবার নিয়ে আলোচনা করা হল-
যেসব সবজি খাবেন-চিচি’ঙ্গা, লাউ, করলা, বিচি ছাড়া শশা, সজনা, ডাঁটাশাক, লালশাক, কচুশাক, ঝিংগা, পেঁপে, হেলেঞ্চা শাক ইত্যাদি।
যেসব সবজি খাবেন না- ফুলকপি, বাঁধাকপি, পালংশাক, কচু, মুলা, পুঁইশাক, ঢেঁড়স, গাজর, কাঁঠালের বিচি, শিমের বিচি, মুলা’শাক ইত্যাদি। প্রাণিজ আমিষ, যেমন- মাছ, মাংস, দুধ, ডিম ইত্যাদি সীমিত পরিমাণে খাবেন। ডাব, কলা, আঙুর একেবারেই খাবেন না, কেননা, এতে পটাশিয়ামের পরিমাণ বেশি। কিডনি রোগীদের র’ক্তে পটাশিয়ামের মাত্রা বাড়তে থাকে। কম পটাশিয়ামযুক্ত ফল যেমন- আপেল, পেয়ারা, পাকা পেঁপে, নাসপাতি ইত্যাদি।

রোগীর খাদ্যতালিকায় প্রোটিন রাখতে হবে রোগের মাত্রার ওপর ভিত্তি করে। যেমন- রোগীর র’ক্তের ক্রিয়েটিনিন, শরীরের ওজন, ডায়ালাইসিস করেন কিনা, করলেও স’প্তাহে কয়টা করেন তার ওপর নির্ভর করে প্রোটিনের মাত্রা নির্ধারণ করতে হবে। যেমন- কিডনি রোগ শনাক্ত হওয়ার পর প্রতিকেজি দৈহিক ওজনের জন্য প্রোটিনের প্রয়োজন ০.৫-০.৮ গ্রাম। গু’রুতর রোগীর জন্য ০.৫ গ্রাম। উপরোক্ত নির্দেশনা অনুযায়ী খাদ্যতালিকা তৈরি করে খাবার খেলে কিডনি রোগ অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।